ঢাকার কেরানীগঞ্জের মেয়ে কাশফিয়া চৌধুরী ধীরে ধীরে নিজের একটি আলাদা পরিচয় গড়ে তুলছেন মিডিয়া অঙ্গনে। নয়াবাজার বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে এইচএসসি শেষ করা এই তরুণী গত চার বছর ধরে মিডিয়ায় নিজের জায়গা তৈরি করার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। জন্ম ও বেড়ে ওঠা কেরানীগঞ্জেই হলেও তার স্বপ্নের পরিধি এখন অনেক বড়।
কাশফিয়ার মিডিয়ায় পথচলা শুরুটা খুব পরিকল্পিত ছিল না। মূলত ছবি তোলার শখ থেকেই তার প্রথম যাত্রা। শখের ফটোশুট, ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয় এবং ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা ধীরে ধীরে তাকে নিয়ে আসে আলোচিত এই অঙ্গনে। নিজের প্রথম কাজের অভিজ্ঞতা স্মরণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, শুরুটা ছিল ভয় আর উত্তেজনার এক অদ্ভুত মিশ্রণ। নার্ভাসনেস ছিল, তবে তার চেয়েও বেশি ছিল নতুন কিছু করার রোমাঞ্চ।
ছোটবেলা থেকেই গ্ল্যামার জগতের প্রতি ছিল তার এক আলাদা টান। টিভিতে ফ্যাশন শো দেখতেন আগ্রহ নিয়ে, আর সেজন্য মায়ের বকাও খেতে হতো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজে নিজে হাঁটার অনুশীলন করা, অভিনয়ের ভঙ্গি করা, নিজেকে কল্পনায় বড় মঞ্চে ভাবা, সবই ছিল তার ছোটবেলার অভ্যাসের অংশ। তবে এই স্বপ্নের পথ একেবারেই মসৃণ ছিল না। ছোটবেলায় তাকে নিয়ে অনেক ট্রল করা হতো। “মিস ইউনিভার্স ঐশ্বরিয়া” বলে কটাক্ষ করা হতো, যা তাকে মানসিকভাবে কষ্ট দিত। এমনও সময় গেছে, যখন তিনি বাসা থেকে বের হওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন, কারও সঙ্গে কথা বলতে চাইতেন না।
তবুও থেমে যাননি কাশফিয়া। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজের ভেতরের শক্তিকে চিনেছেন, নিজেকে গড়েছেন। স্থিরচিত্রের গণ্ডি পেরিয়ে যখন নিজেকে চলমান দৃশ্যে প্রকাশ করার ইচ্ছে জোরালো হতে থাকে, তখনই তিনি মডেলিংয়ের দিকে আরও মনোযোগী হন। তার ভাষায়, আশপাশের মানুষ সবসময় তার হাঁটার স্টাইলের প্রশংসা করতেন, আর সেখান থেকেই তার মনে হয়েছে, র্যাম্প ও মডেলিংয়ের জগতে তিনি ভালো কিছু করতে পারবেন।
মিডিয়ায় নতুনদের মতো কাশফিয়ার পথেও এসেছে নানা চ্যালেঞ্জ। তার মতে, নবাগত হিসেবে সবচেয়ে বড় লড়াই হলো নিজের স্বকীয়তা ধরে রাখা এবং সঠিক মেন্টর খুঁজে পাওয়া। গ্ল্যামারের আড়ালে যে পরিমাণ অপেক্ষা, ধৈর্য আর কঠোর পরিশ্রম লুকিয়ে থাকে, সেটিই তিনি সবচেয়ে বড় শিক্ষা হিসেবে দেখেন। তিনি বিশ্বাস করেন, জীবনের লক্ষ্য পূরণের পথে বাধা আসবে, ভুল হবে, ব্যর্থতা আসবে, তবে সেটাই শেষ নয়। বরং ব্যর্থতা মানুষকে নতুনভাবে শেখার সুযোগ দেয়। নিজের ওপর বিশ্বাস রাখাটাই সবচেয়ে জরুরি।
বর্তমানে কাশফিয়া ব্যস্ত সময় পার করছেন ফ্যাশন শো নিয়ে। তবে তার আগ্রহ এখন শুধু র্যাম্প বা মডেলিংয়ে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি ভবিষ্যতে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম এবং চলচ্চিত্রে কাজ করতে চান। কাজ বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তিনি সবসময় গল্পের মান এবং চরিত্রের গভীরতাকে প্রাধান্য দিতে চান। অর্থাৎ, শুধু উপস্থিতি নয়, তিনি নিজেকে একজন দক্ষ পারফর্মার হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করতে চান।
পরিবারের সমর্থনের প্রসঙ্গেও খোলামেলা কাশফিয়া। তিনি জানান, শুরুতে পরিবার তার এই পথচলাকে সহজভাবে নেয়নি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে যখন তারা দেখেছেন তিনি বিষয়টিকে কতটা সিরিয়াসলি নিচ্ছেন, তখন তারাও ধীরে ধীরে পাশে দাঁড়িয়েছেন। কাশফিয়ার মতে, পরিবারের সমর্থন ছাড়া এই জগতে টিকে থাকা সত্যিই কঠিন। কারণ, যেকোনো স্বপ্নকে দীর্ঘপথে এগিয়ে নিতে সবচেয়ে বেশি দরকার কাছের মানুষের বিশ্বাস।
অনুপ্রেরণার জায়গায় কাশফিয়া শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন শাবনূর, হুমায়ূন ফরিদী, জয়া আহসান এবং অপি করিম-এর মতো গুণী শিল্পীদের। তাদের কাজ, অভিনয় দক্ষতা এবং নিজ নিজ অবস্থান তাকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করে।
নতুনদের জন্যও তার বার্তা বেশ স্পষ্ট। শর্টকাটে নয়, বরং পরিশ্রম, দক্ষতা ও প্রস্তুতির মাধ্যমে এগিয়ে যেতে হবে। অভিনয়ের কর্মশালা, গ্রুমিং এবং নিজেকে প্রতিনিয়ত শাণিত করার মধ্যেই তিনি সাফল্যের চাবিকাঠি দেখেন। তার মতে, বড় অর্জনের আগে ছোট ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ করা উচিত। কারণ প্রতিটি ছোট সাফল্যই আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দেয়।
নিজের ভুল নিয়েও তিনি ইতিবাচক। হতাশ না হয়ে ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়াকেই তিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। নিজের শক্তির জায়গা খুঁজে বের করে সেটিকে আরও শক্তিশালী করে তোলার মধ্যেই তিনি দেখেন উন্নতির পথ।
সবশেষে, কাশফিয়া চৌধুরীর স্বপ্ন খুব পরিষ্কার, তিনি শুধু আলোয় আসতে চান না, বরং একজন দক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও প্রতিষ্ঠিত শিল্পী হিসেবে দর্শকদের মনে স্থায়ী জায়গা করে নিতে চান।






0 মন্তব্যসমূহ