জয়শ্রী ঘাট থেকে রাত ঠিক ১০টার দিকে লঞ্চে উঠেছিলাম। গন্তব্য সুনামগঞ্জ, ভোর ৫টার দিকে পৌঁছানোর কথা। নদীর বুকজুড়ে কালো জল, দূরে দূরে টিমটিমে আলো, মাঝেমধ্যে ইঞ্জিনের ভারী শব্দ, সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত মায়াবী পরিবেশ। জয়শ্রীর ঘাট ছাড়তেই মনে হলো, আমি যেন শুধু জায়গা বদল করছি না, একটা নতুন গল্পের ভেতর ঢুকে পড়ছি।
এই যাত্রাতেই পরিচয় হলো ফারুক ভাইয়ের সঙ্গে। ধর্মপাশা থানার পুলিশ সদস্য, থানার কাজেই সুনামগঞ্জ যাচ্ছেন। প্রথম আলাপটা খুবই সাধারণ ছিল। কোথায় যাচ্ছি, কী করি এইসব কথাবার্তা। কিন্তু অল্প সময়েই বুঝলাম, মানুষটা আলাদা মনের।
ডেকে দাঁড়িয়ে নদীর হাওয়া খেতে খেতে গল্প হচ্ছিল। তার কথায় ছিল আন্তরিকতা, ব্যবহারে ছিল ভদ্রতা। হঠাৎ বললেন, ‘চলেন, আমাদের এসআই সাহেবের সাথে পরিচয় করাই।’
আমি একটু ইতস্তত করলেও গেলাম। সেখানে গিয়ে যে সম্মান পেলাম, তা সত্যিই অপ্রত্যাশিত। ফারুক ভাই পরিচয় করিয়ে দিলেন, ‘ স্যার, এই ছেলের নাম সাইফুল বারী। অনেক সৌখিন মানুষ।’
নিজের নামটা তার মুখে এভাবে শুনে একটু লজ্জা লাগল, আবার ভালোও লাগল। একজন প্রায় অচেনা মানুষ এত সুন্দরভাবে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন,এটা হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
এসআই সাহেব খুব আন্তরিকভাবে বসতে বললেন। চা-বিস্কুট আনালেন। অচেনা জায়গায়, অচেনা মানুষের এমন আপ্যায়ন সত্যিই বিরল। চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠছিল, আর সেই উষ্ণতার সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল মানুষের আন্তরিকতা। বিস্কুটের ফাঁকে ফাঁকে চলছিল গল্প, এলাকার কথা, নদীপথের কথা, দায়িত্বের কথা।
আমরা অনেক সময় পুলিশের কঠোর দিকটাই দেখি। কিন্তু আজ দেখলাম তাদের মানবিক মুখ। দায়িত্বের ভেতরেও কতটা মমতা থাকতে পারে, সেটা উপলব্ধি করলাম কাছ থেকে।
চা শেষ করে উঠে আসার পরও ফারুক ভাইয়ের সঙ্গে গল্প থামেনি। আমার গন্তব্যের কথা শুনে তিনি বললেন,
‘আপনাকে আগে দিরাই নামিয়ে শাহ আবদুল করিমের বাড়ির গাড়িতে উঠিয়ে দিই, তারপর আমি সুনামগঞ্জ ফিরবো।’
আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। নিজের কাজের মাঝেও একজন প্রায় অচেনা মানুষের পথ নিশ্চিত করার এমন আন্তরিকতা! আমরা দু’জন নম্বর আদান-প্রদান করলাম।
তিনি বললেন, ‘কোনো সমস্যা হলে আমাকে কল দিবেন।’ এই একটি বাক্য যেন রাতের নদীপথে আমার ভরসা হয়ে রইল।
এখন ফারুক ভাই ঘুমাচ্ছেন। আর আমি লঞ্চের ক্যান্টিনে বসে আছি। ক্যান্টিনের আলো ম্লান, কয়েকজন যাত্রী চুপচাপ বসে। ক্যান্টিনের এক পিচ্চি ছেলের সঙ্গে আলাপ জমে গেল।
আমি বললাম, ‘তোমাদের থানার পুলিশ কিন্তু অনেক অতিথিপরায়ণ।’
সে হেসে বলল, ‘ভাই, পুলিশগুলো আসলেই অনেক ভালো।’
তার সরল কথায় মনে হলো, ভালো মানুষ আসলে সব জায়গাতেই আছে। শুধু চোখ খুলে দেখার দরকার।
লঞ্চ এগিয়ে চলছে। জয়শ্রীর ঘাট অনেক পেছনে পড়ে গেছে। সামনে সুনামগঞ্জ, সামনে নতুন সকাল। কিন্তু আজকের এই রাত, এই নদী, এই অচেনা মানুষের আন্তরিকতা, সব মিলিয়ে যাত্রাটা মনে গেঁথে থাকবে।
রাত ১০টায় জয়শ্রী থেকে লঞ্চে উঠেছিলাম।
ভোর ৫টায় সুনামগঞ্জ পৌঁছাবো।
পথ শুধু দূরত্ব মাপে না, পথ মানুষ চিনিয়ে দেয়। আজকের এই যাত্রা তারই প্রমাণ।
লেখক: সাইফুল বারী, গীতিকবি
১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬









0 মন্তব্যসমূহ