Header Ads Widget

যারা শিল্প ও সংস্কৃতি বুকে লালন করে, আমি তাদের অনুপ্রাণিত করতে চাই: ইউএনও পরিমল কুমার সরকার

ছবি: সংগৃহীত

যাযাবর পলাশ, বিনোদন পোস্ট: রাত কি আর দিন কি? তার কাছে যেন সেই চিন্তাই নেই। শুধু কাজ আর মানুষের সমস্যা ও সেবা নিয়েই তার দিনাতিপাত। বলছি এদেশের একজন প্রজাতন্ত্রের ফ্রন্টলাইন সেনাপতি পরিমল কুমার সরকারের কথা। উত্তরবঙ্গের দিনাজপুর জেলার বিরামপুর উপজেলার 'উপজেলা নির্বাহী অফিসার' তিনি। তবে নেই কোন সরষে পরিমাণ অহংকার বা বিরক্তি। সারা দিন-রাত এক করে শুধু জনসেবায় নিয়োজিত থাকাই যেন তার নেশা। যে কোন অসহায়, অবহেলিত বা নির্যাতিত মানুষ তার কাছে এসে খালি হাতে ফিরেননা। বিরামপুর উপজেলার ইতিহাসে সবচেয়ে জনসম্পৃক্ত এবং মানবিক একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে এ উপজেলাবাসীর আস্থা অর্জন করেছেন ইউএনও পরিমল কুমার সরকার। শুধু অফিসেই নয়, যে কারও বিপদের খবর পেলে মধ্যরাতেও ছুটে যান একদম অজো পাড়াগাঁয়েও। 

সম্প্রতি তিনি তাঁর ক্যাডার জীবনের ৯ম বর্ষে পদার্পণ করলেন। একটি একান্ত আলাপচারিতায় এই অনুভূতি জানাতে গিয়ে তিনি বললেন, আসলে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস অত্যন্ত সম্মানের একটি জায়গা। সেখানে দীর্ঘ ৮ টি বছর অতিবাহিত করে ৯ম বছরে পদার্পন করায় অবশ্যই নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি। তবে এখনো অনেক পথ বাঁকি আছে। অনেক কাজ করতে হবে। যতটা সময় পার করেছি, সেটা ছিলো শেখার সময়। সামনে আরও অনেক শিখতে হবে এবং এই দেশের জন্য অনেক দায়িত্ব পালন করতে হবে। সেটা করতে চাই। 

বিরামপুর উপজেলার দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর তিনি ভেবেছিলেন যে, এখানকার যুব সমাজকে কাজে লাগাতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোকে আরও আধুনিক ও শিক্ষার মান বাড়াতে হবে। এটা সীমান্তবর্তী উপজেলা হওয়ায় মাদকের আগ্রাসন অত্যন্ত প্রকট, সেটা কমাতে হবে। এই উপজেলার রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, বীর মুক্তিযোদ্ধা বৃন্দ সহ সবাইকে নিয়ে কাজ করতে চেয়েছেন। সেই লক্ষ্যেই কাজ করছেন এবং এখনও সেই চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন তিনি।
 
ইউএনও পরিমল কুমার সরকার এর ছেলেবেলা কেটেছে তাঁর জন্মস্থান গাইবান্ধা জেলায়। তিনি  গাঁয়ের  ছেলে। গ্রামের স্কুলে মাধ্যমিক পাশ করে গাইবান্ধা জেলা শহরে এইচএসসি পাশ করেন। এরপরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পর ৩৩ তম বিসিএসে প্রশাসনিক ক্যাডার হিসেবে এই চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এসএসসি পর্যন্ত যেহেতু গ্রামেই ছিলাম, সেহেতু গ্রামের পরিবেশ, গ্রামের মানুষ তথা মাটি ও মানুষের সাথে মিলেমিশে থাকার যে টান সেটা এখনও আমার মাঝে রয়ে গেছে। তবে এ পর্যন্ত আসতে গিয়ে অনেক চড়াই উৎরাই এবং ত্যাগ তিতিক্ষার পরেই এই অবস্থানে আসতে পেরেছি নিঃসন্দেহে। কারণ, একজন গ্রামের ছেলে হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে প্রশাসনিক ক্যাডারে আসা এটা অবশ্যই সহজসাধ্য বিষয় ছিলোনা। এজন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। এবং আমার বাবা-মার আশীর্বাদ ও দোয়া না থাকলে আমি আজকের এই ইউএনও পরিমল কুমার সরকার হতে পারতাম না। যাই হোক, এই মা ও মাটির কাছে আমার যে ঋণ, সেই ঋণ শোধ করার চেষ্টা সবসময় আমি চালিয়ে যাচ্ছি। এজন্য সকলের দোয়া চাই।

বিরামপুর উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত সরকারের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল নাগরিক সেবা পদ্ধতি কতদূর এগিয়েছে? এমন একটি প্রশ্নের জবাবে পরিমল কুমার সরকার বললেন, আপনারা জানেন যে বাংলাদেশ সরকার এদেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সারাদেশেই ডিজিটালের ছোঁয়া লেগেছে। সেই প্রেক্ষিতে বিরামপুর উপজেলাও পিছিয়ে নেই। এখন বিরামপুরের প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত ডিজিটাল নাগরিক সেবা অনেকদূর এগিয়ে গেছে। বিশেষ করে আমাদের ভূমি মেনেজমেন্টে অনেক কাজ হয়েছে। সেই সাথে জন্ম নিবন্ধন, মৃত্যু নিবন্ধন এবং আমাদের সমাজসেবা দপ্তরের বিভিন্ন ভাতা সবকিছুই এখন ডিজিটালাইজেশন এর মধ্যে আছে। এছাড়া আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি সরকারের যে উদ্যোগ, ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণ, সেটাকে শতভাগ বাস্তবায়নের জন্য যা যা করা দরকার তার সবকিছুই আমরা করে যাচ্ছি। এবং তার ফল এই উপজেলাবাসী পেতে শুরু করেছে।

ইউএনও পদটা প্রচন্ড ব্যস্ততম আর চ্যালেঞ্জিং একটা পদ , এর ভালো লাগা মন্দ লাগা গুলো জানতে চাইলে তিনি জানালেন, নিঃসন্দেহে এই পদটি অনেক চ্যালেঞ্জিং এবং ব্যস্ততম একটি পদ। তারপরও এই ব্যস্ততার মধ্যেও আনন্দ আছে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে যে, সমাজের অবহেলিত এবং নিগৃহীত মানুষের সেবা করার সুযোগ আছে, তাদের পাশে দাঁড়ানো যায়। এটাই ভালো লাগার সবচেয়ে বড় একটা বিষয়। ব্যস্ততা থাকবেই। যেখানে ব্যস্ততা আছে, সেখানেই প্রাপ্তি আছে, সেখানেই সম্মান আছে, সেখানেই আমাদের এই সিভিল সার্ভেন্ট হিসেবে সার্থকতা আছে। মানুষকে নিয়েই আমাদের কাজ, মানুষের জন্যই কাজ।

দেশের উন্নয়নের ধারাকে অব্যহত রাখার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যে প্রচেষ্টা, সেই বিষয়ে যদি কিছু আলোকপাত করে তিনি বলেন,  বর্তমান সরকার অনেকগুলো উন্নয়নমুখী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার ১০টি বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। তার মধ্যে গৃহহীনদের জন্য আশ্রয়ন প্রকল্প, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ, সবার জন্য শিক্ষা এধরনের অনেকগুলো উদ্যোগ রয়েছে। এই প্রকল্পগুলো অনেকাংশেই এগিয়ে গেছে। সম্প্রতি আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মাণ হয়েছে। আমাদের দক্ষিণবঙ্গের মানুষ কিন্তু এর সুবিধা পেতে শুরু করেছে।  ২০৪১ সালের মধ্যে আমরা যে উন্নয়নশীল দেশের স্বপ্ন দেখছি, সেই স্বপ্নের পথেই কিন্তু আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। অদূর ভবিষ্যতে আমরা উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় পৌঁছে যাবো ইনশাআল্লাহ। 

একজন সঙ্গীতমনা বা সংস্কৃতিমনা মানুষ হিসেবে বিরামপুর  উপজেলায়  কদর রয়েছে ইউএনও পরিমল কুমার সরকার এর। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংস্কৃতিমনা বলতে যারা শিল্পী বা আবৃত্তিকার অর্থাৎ যারা শিল্প ও সংস্কৃতি বুকে লালন করেন তাদের আমি উৎসাহ এবং অনুপ্রেরণা যোগাতে চাই। এছাড়াও যারা খেলাধূলা করে তাদেরও উৎসাহিত করার চেষ্টা করি। এতে করে আমরা বাল্যবিবাহ এবং মাদকের ভয়াল থাবা থেকে দূরে থাকতে পারবো বলে মনে করি। এজন্যই মূলত আমি এই অঙ্গনের মানুষদের পাশে থাকার এবং সার্বিক সহযোগিতা করার চেষ্টা করি। 

প্রচন্ড ব্যস্ততায় পরিবারকে কিভাবে সময় দেন জানতে চাইলে তিনি বললেন, দেখুন আমাদের যে সার্ভিস বা পেশা যাই বলুন, সেটা নিঃসন্দেহে প্রচন্ড ব্যস্ততম। প্রত্যেকটা সময় ব্যস্ত থাকতে হয়। কিন্তু এর মাঝেও পরিবারকে সময় দেয়ার চেষ্টা করি। সময় তো দিতেই হবে। তবে ফ্যামিলিও বোঝে যে এটা সরকারি একটি দায়িত্ব আর দেশের জন্যই তো কাজ করা, তাই প্রথম অবস্থায় সামান্য বিরক্তি থাকলেও এখন সেটা মানিয়ে নিয়েছে। আমার সহধর্মিণী এ বিষয়ে যথেষ্ট কেয়ারফুল, সে সবসময়ই সহযোগিতা করে। 

 বিরামপুর উপজেলায় স্মরণীয় একটি অর্জনের কথা স্মরণ করে পরিমল কুমার সরকার বলেন, বিরামপুরে আসার পর মনে রাখার মতো অল্পকিছু কাজের মধ্যে সবচেয়ে বড় অর্জন যদি বলতে হয় সেটা হচ্ছে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যে অঙ্গীকার, এদেশে ভূমিহীন বা গৃহহীন কেউ থাকবে না। সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ইতোমধ্যেই এই উপজেলায় ৯৬৭ টি ঘর নির্মাণ হয়েছে। এটা একটা বড় অর্জন হিসেবে আমি মনে করি। কারণ, আমার মাধ্যমে এই উপজেলায় ৯৬৭ টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে তাদের নিজের বাড়ি উপহার দিতে পেরেছি। এটা স্মরণীয় হয়ে থাকবে। 

 তিনি আরও বলেন,  বিরামপুরের উদ্দেশ্যে বলবো, বিরামপুরকে একটু বেশিই আপন করে ফেলেছি। বিরামপুর আরও এগিয়ে যাক, আমি সেই লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছি। বিরামপুরের মানুষের সাথে এমনভাবে মিশে গিয়েছি যে, নিজেকে এই শহর এর মানুষ বলেই ভাবি সবসময়। তাই ভবিষ্যতে আমি যদি শুনি বিরামপুর আরও উন্নতি করেছে, তাহলে খুব ভালো লাগবে। এরসাথে এই দেশের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, আমরা বীরের জাতি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছি। যে চেতনা ও লক্ষ্য নিয়ে আমরা এদেশ স্বাধীন করেছি তা যেন অর্জন করতে পারি। জাতির পিতা যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য আরও বেশি বেশি কাজ করতে হবে। এজন্য আমাদের এ জাতিকে শিক্ষিত, দক্ষ এবং পরিশ্রমী হতে হবে। আমরা যেন দেশের বাইরে দক্ষ শ্রমিক পাঠিয়ে দেশে আরও রেমিট্যান্স বাড়াতে পারি, খেলাধুলা ও পোশাক শিল্পের আরও উন্নয়ন ঘটাতে পারি যেন সেই চেষ্টাও করে যেতে হবে। সর্বোপরি এমন একটি দেশ যেন আমরা গড়তে পারি যেন এ দেশের মানুষ বিদেশে নয়, বিদেশের মানুষ এদেশে কাজ খূঁজতে আসবে। আমরা চাইলেই সেটা সম্ভব।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ